মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের কোন সরাসরি সম্পর্ক দেখা যায়
না। কিন্তু উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ লাঘব হলে সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো থাকার পাশাপাশি
রক্তচাপ কম থাকতে দেখা যায়।
যেকোনো উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী পরিস্থিতিতে প্রত্যেকেরই রক্তচাপ
সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে উদ্বেগজনিত রক্তচাপের এরকম বাড়াটা কি
দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চ রক্তচাপে পরিণত হতে পারে? কিংবা বার বার অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে রক্তচাপ বেড়ে
যেতে যেতে এক সময় কি তা সত্যিকারের উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে? দেখা যায় যে সকল
কার্যকলাপে উদ্বেগ কমে এবং মানসিক চাপ লাঘব করে, সে গুলো উদ্বেগজনিত অতিরিক্ত
রক্তচাপ কমায়। যেমন- প্রতিদিন এক ঘণ্টা হাঁটলে, দৌড়ালে কিংবা জগিং করলে উদ্বেগ
কমে, আবার রক্তচাপও কমে। এ ধরণের শারীরিক পরিশ্রম দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ রক্তচাপ কমাতেও
সাহায্য করে।
যে কোন উদ্বেগজনক
পরিস্থিতি এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে আমাদের শরীরে নানারকম হরমোন এবং অন্যান্য
রাসায়নিক উপাদান নিঃসৃত হয়। এ সকল হরমোনের
প্রভাবে হৃদঘাত বেড়ে যায় এবং রক্তনালী সংকুচিত হয়। ফলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। এখন
পর্যন্ত এমন কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই যার সাহায্যে বলা যায়, মানসিক চাপ দীর্ঘ
মেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের কারণে আমরা এমন
কিছু কাজ করি যা উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করতে সাহায্য করে। যেমন- উদ্বেগজনক
পরিস্থিতিতে এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ থাকলে অনেকে অতিরিক্ত ভোজন করেন, মদ্য পান
করেন, ধূমপানের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং নিদ্রাহীনতায় ভুগে থাকেন। এ সকল অভ্যাস শরীরের
ওজন বাড়ায় এবং পাশাপাশি রক্তচাপও বাড়ায়। শুধু তাই নয় ক্রমাগত অতিরিক্ত মানসিক
চাপের মধ্যে বসবাসকারী ব্যক্তির রক্তচাপ শেষ পর্যন্ত বাড়ন্তই থেকে যায়।
এটাও সত্য যে উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষণ্ণতা ও
বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা বোধ ইত্যাদি হৃদরোগ সৃষ্টি করতে পারে।
কারণ উদ্বেগের ফলে যে সকল অতিরিক্ত হরমোন নিঃসৃত হয়, তা রক্তনালীর ক্ষতিসাধন করে
এবং এমন পরিবর্তন ঘটায় যা হৃদরোগের কারণ। আর অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ যে
হতাশাবোধ এবং বিষণ্ণতা সৃষ্টি করে , তার ফলে অনেক আত্মঘাতী মনোভাব সৃষ্টি হয়।
যেমন- সময়মতো ওষুধ সেবন না করা, স্বাস্থ্যহানিকর আচরণ এবং কার্যক্রমে জড়িত হয়ে
পড়া।
আগেই বলা হয়েছে উদ্বেগ
এবং মানসিক চাপ সাময়িক রক্তচাপ বাড়ালেও তা দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে না
এবং উদ্বেগ কেটে গেলে রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু বারবার উদ্বেগ ও মানসিক পীড়ন রক্ত
নালীর ক্ষতিসাধন করে; এমন কি হৃদরোগ এবং কিডনির সমস্যা সৃষ্টি করে। আর উদ্বেগ ও
মানসিক পীড়নের ফলে যে সকল প্রতিক্রিয়ামূলক আচরণ সৃষ্টি হয়, যেমন- ধূমপান, মদ্যপান,
অতিভোজন কিংবা খাদ্যে অনীহা ইত্যাদি উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি সৃষ্টি করে এবং এগুলোর
কারনেও গুরুতর হৃদরোগ, এমনকি স্ট্রোক বা মস্তিস্কের পক্ষাঘাত হতে পারে।
অতএব মানসিক চাপ লাঘব
করা এবং উদ্বেগমুক্ত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরফলে সার্বিকভাবে আমাদের শারীরিক
সুস্থতা বজায় থাকে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। উদ্বেগমুক্ত ও
মানসিকচাপবিহীন জীবনযাপনের জন্য নানারকম পদ্ধতি এবং কৌশল অনুসরণ করা যেতে পারে।
যেমনঃ
- প্রাত্যহিক
কার্যক্রমের রুটিনটি সহজসাধ্য রাখতে হবে। যে সকল কাজ জরুরী সেগুলিকে
প্রাধান্য দিতে হবে এবং প্রতিটি কাজ যেন স্বাভাবিক গতিতে সুচারুরূপে সম্পন্ন
করা যায় তার জন্য যথেষ্ট সময় হাতে রাখতে হবে। গুরুত্বহীন কার্যকলাপে সময় ব্যয়
না করা উত্তম।
- শিথিলায়নের
জন্য শ্বাসগ্রহণ, সচেতন শিথিলায়নের জন্য গভীর শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করার
অভ্যাস রপ্ত করা শরীরের জন্য উপকারী।
- নিয়মিত
শরীরচর্চা করা মানসিক চাপ লাঘবের জন্য অত্যন্ত উপকারী। অতিব্যস্ত মানুষও যদি
প্রতিদিন আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা হাঁটেন, দৌড়ান কিংবা জগিং করেন , তা
উদ্বেগনাশক এবং রক্তচাপ ৫ থেকে ১০ মিঃ মিঃ পারদচাপ
কমায়।
- যোগ
ব্যায়াম এবং ধ্যানচর্চা করা যেতে পারে। এর ফলেও মানসিক স্থিতি এবং প্রশান্তি
লাভ করা যায় এবং তা রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
- পর্যাপ্ত
ঘুম অত্যন্ত দরকারী। নিদ্রাহীনতা
উদ্বেগ বাড়ায়, মানসিক চাপের জটিলতা বৃদ্ধি করে। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুম মনে
প্রশান্তি আনে, পরিস্থিতিকে সহনীয় করে তোলে।
- ইতিবাচক
মনোভাব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। সমস্যা মোকাবেলা করতে হলে সমাধান খুঁজতে হবে। অভিযোগ করে কিংবা
নেতিবাচক মন্তব্য করে কোন সমস্যার সমাধান করা যায় না। অতএব স্থির মস্তিস্কে
সমস্যা থেকে উত্তরনের জন্য সমাধান খুঁজে তা প্রয়োগ করা উদ্বেগ ও মানসিক চাপ
কমানোর প্রকৃত ওষুধ।
ব্যক্তিবিশেষে
উদ্বেগলাঘব ও মানসিক চাপ কমানোর কৌশল ভিন্ন হতে পারে। কৌশল যাই হোক উদ্বেগমুক্ত
থাকা এবং মানসিকচাপবিহীন থাকার চেষ্টা করার বিকল্প নেই।

No comments:
Post a Comment