।।সাতাশ।। বিনা ওষুধে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনঃ জীবনাচরণ পরিবর্তন



            



        আগে বলা হতো ওষুধ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ; আজকাল বলা হয় জীবনাচরণ পরিবর্তন এর মধ্যে রয়েছেঃ 

·         শরীরের ওজন কমানো,

·         শারীরিক পরিশ্রম ব্যায়াম,

·         সুষম খাদ্য গ্রহণ,

·         পাতে লবণ না খাওয়া এবং

·         মদ্যপান পরিহার করা

এগুলি মেনে চললে উচ্চ রক্তচাপ এবং এর জটিলতা সমূহ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা যায় ওষুধ ছাড়া অন্যান্য কৌশল ওষুধের পরিপূরক মাত্র, বিকল্প নয় কোন রোগীকে ওষুধের সাহায্যে প্রথম থেকেই চিকিসা করতে হবে কিনা কিংবা কি ওষুধ দিয়ে চিকিসা করতে হবে তা একজন চিকিসকই সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারেন


·         শরীরের ওজন কমানো

ওজন বাড়া, স্থূলকায় হওয়া কিংবা মেদ ভুঁড়ি থাকা উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়  প্রকৃত পক্ষে ওজন বাড়লে রক্তচাপ বেড়ে যায় বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় গড় পড়তা কেজি ওজন কমাতে পারলে রক্তচাপ  . থেকে ১০ মিঃ মিঃ পারদচাপ  কমে যায় যাদের ওজন অধিক এবং উচ্চ রক্তচাপ আছে তাদের জন্য ওজন কমানো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অতিরিক্ত ওজন এবং মেদ ভুঁড়ির সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ছাড়া ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং কোলেস্টেরলের আধিক্যের সম্পর্ক রয়েছে ওজন বাড়লে রক্তে গ্লুকোজ বাড়ে অর্থাডায়াবেটিস হয় আর রক্তে কোলেস্টেরলও বেড়ে যায় ডায়াবেটিস এবং রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল   দুটোই হৃদরোগের ঝুঁকি বা কারণ মোটা মানুষের ওজন কমালে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে আসে  ইনসুলিনের কাজ করার ক্ষমতা বেড়ে যায় ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয় এর জন্য হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি কমে যায় শরীরের ওজন ১০% কমাতে পারলে হৃদরোগের ঝুঁকি ৩০% কমে যায়

কেউ স্থূলকায় কিনা তা দু ভাবে সহজেই বুঝতে পারা যায়- শরীরের ঘনত্ব সূচক (Body mass index) এবং কোমরের পরিধি (Waist circumference)

শরীরের ঘনত্ব সূচক বা বি এম আই কারোর উচ্চতার তুলনায় শরীরের ওজন নির্দেশ করে এর সাহায্যে শরীরের মোট চর্বির পরিমাণ অনুমান করা যায় আর চর্বির পরিমাণ বাড়া মানেই হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়া তবে যাদের শরীর পেশীবহুল কিংবা যাদের শরীরে অতিরিক্ত পানি জমেছে তাদের বেলায় বি এম আই সঠিক তথ্য নির্দেশ করে না  জন্য কোমরের পরিধি মাপা উচি পেটে চর্বি বাড়লে কোমরের পরিধি বেড়ে যায় পুরুষদের কোমরের পরিধি ৪০ ইঞ্চির বেশী আর মেয়েদের ৩৫ ইঞ্চির বেশী হলে তা বিপজ্জনক বি এম আই ২৫ থেকে ২৯. হলে শরীরের ওজন অধিক  (Over weight) বলে গণ্য করা হয় আর কারও এটা ৩০ কিংবা তারচেয়ে বেশী হলে তাকে স্থূলকায় (Obese) হিসেবে ধরা হয়

শরীরের ওজন কমানো সহজ কাজ নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫% থেকে ৩৫% মানুষ মোটা বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের অপুষ্টি ভারাক্রন্ত একটি দেশ হলেও আমাদের দেশে স্থূলকায়দের সংখ্যা বাড়ছে প্রতি পাঁচজন পুরুষের একজন প্রতি তিনজন মহিলার একজন অবিরাম ওজন কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে ওজন কমানোর এই প্রানান্তকর প্রয়াসকে অনেকে মার্ক টোয়েনের ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেন মার্ক টোয়েন রসিকতা করে বলেছিলেন,ধূমপান ছাড়া খুবই সহজ আমি শতবার এটা ছেড়েছি (ÒGiving up smoking is easy; I have done it hundreds of times.” )

একটু যত্ন সহকারে নিয়মিত চেষ্টা করলে ওজন কমানো কঠিন কাজ নয় প্রতিদিন আমরা যে পরিমাণ শক্তি খাবারে গ্রহণ করি, ঠিক সেই পরিমাণ আবার নানা কাজ কর্মে খরচ করি শক্তি খরচের বেলায় কার্পণ্য করে শক্তি জমিয়ে রাখার কিংবা অপব্যয়ীর মতো অতিরিক্ত শক্তি খরচ করে দেউলিয়া হওয়ার অবকাশ নেই আমরা যদি কখনও বেশী খাওয়া-দাওয়া করে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করি এবং আলসেমি করে বা কাজকর্ম না করে কিছু অতিরিক্ত ক্যালরি জমিয়ে ফেলি তা হলে সেটা নিয়ে শরীর কি করে? অতিরিক্ত অর্থ যেমন আমরা ব্যাংকে সঞ্চয় করি; শরীরও তেমন অতিরিক্ত শক্তিকে চর্বি বানিয়ে জমিয়ে রাখে উল্টো ভাবে শক্তির যদি ঘাটতি পড়ে? শরীর তখন জমানো চর্বি খরচ করতে থাকে 

শরীরে শক্তির ঘাটতি বাড়ানো কোন কঠিন কাজ নয় শুধু কষ্ট করে খাওয়াদাওয়া কমিয়ে দিলেই হয় ওজন কমানোর আরেকটি উপায় বেশী বেশী ব্যায়াম করা এভাবে প্রতিদিন আমরা প্রচুর শক্তি বা ক্যালরি খরচ করতে পারি কিন্তু ওজন কমানোর জন্য যত ব্যায়াম করা দরকার তা সব সময় হয় না তবে ওজন কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে দুটোই একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে প্রয়োজন মতো দেহচর্চা করলে খুব সহজে ওজন কমানো যায়  

ওজন কমানোর কাজটি সবসময় ধীরে ধীরে করা উচি সপ্তাহে এক কেজির বেশী ওজন কমানো উচিনয় কারও বর্তমান ওজনের ১০% কমানোর লক্ষ্য নিয়ে শুরু করাটাই কার্যকরী কৌশল এবং লক্ষ্য অর্জন করা সহজ

বি এম আই-এর গুরুত্ব কি?

শ্রেণী
বি এম আই
করনীয়
স্বাভাবিক ওজন
১৮.-২৪.
·         ওজন না বাড়ানোর জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে
অতিরিক্ত ওজন (Over weight)
২৫-২৯.
·         ওজন বাড়ানো যাবে না

·         কোমরের পরিধি বেশী হলে ওজন কমাতে হবে
স্থূলকায় (Obese)
৩০ কিংবা বেশী
·         ওজন কমাতে হবে

·         সপ্তাহে পাউন্ডের বেশী ওজন কমানো যাবে না

·         প্রয়োজনে চিকিসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে

যে সকল উচ্চ রক্তচাপের রোগী স্থূলকায়, তাদের ওজন কমানোর জন্য খাদ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যায়ামের ব্যবস্থা করা উচি  ওজন কমানোর কোন যাদুকরী পন্থা নাই সত্য; কিন্তু চেষ্টার অসাধ্য কিছু নাই এক পাউন্ড অতিরিক্ত ওজন মানে ৩৫০০ ক্যালরি অতএব সপ্তাহে এক পাউন্ড ওজন কমাতে হলে প্রতিদিন ৫০০ ক্যালরির সমান কম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে অথবা ৫০০ ক্যালরি ব্যায়ামের মাধ্যমে খরচ করতে হবে বলাবাহুল্য কম খেয়ে আর বেশী পরিশ্রম করে ৫০০ ক্যালরি খরচ করাই সহজসাধ্য


       সাধারণত পর্যায়--এর উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ওজন কমানোর চেষ্টার জন্য তিন থেকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয় অনেক সময় ওষুধ ছাড়াই এদের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এসে যায় আর এতে সফল না হলে অবশ্যই তাদের উচ্চ রক্তচাপ কমানোর ওষুধ সেবন করতে হবে যাদের উচ্চ রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রার, তাদেরও ওষুধ সেবনের পাশাপাশি ওজন কমানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে
    

·         শারীরিক ব্যায়াম
নিয়মিত ব্যায়ামের সাহায্যে শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্য অর্জন করতে পারলে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ এবং চিকিসা করা সহজ হয় এটা ওজন কমাতে সাহায্য করে, সরির-মনকে সতেজ রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় যারা নিয়মিত ব্যায়াম করে তাদের রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবে কম থাকে আর যারা শুয়ে-বসে আলসেমি করে দিন কাটায় তাদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা ব্যায়ামকারীদের চেয়ে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশী


রক্তচাপ কমানোর জন্য অ্যারোবিক ব্যায়াম বেশী উপকারী নির্ভরযোগ্য কয়েকটি পর্যবেক্ষণে রোগীদের এক থেকে আট মাস পর্যন্ত সপ্তাহে তিন দিন ব্যায়াম করতে দেওয়া হয়েছে সাধারণত তাদের ৩০ থেকে ১২০ মিনিট জগিং, দৌড়ানো, সাঁতার কিংবা সাইকেল চালাতে দেওয়া হয়েছে এর ফলে দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের রক্তচাপ ওষুধ ছাড়াই গড়পড়তা ১১/ মিঃ মিঃ পারদচাপ কমে গেছে কিন্তু ব্যায়াম বন্ধ করে দিলে সপ্তাহের মধ্যে রক্তচাপ আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে  

            শারীরিক ব্যায়াম কেন রক্তচাপ কমায় তা এখনও সঠিকভাবে জানা যায় নাই  

তবে হঠাকেউ ব্যায়াম শুরু করলে প্রাথমিকভাবে তার রক্তচাপ বেড়ে যায় অনভ্যস্ত কেউ খুব ভারী ব্যায়াম করলে তার সহসা মৃত্যু হওয়া অস্বাভাবিক না এজন্য উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ব্যায়াম শুরু করার আগে একজন চিকিসকের পরামর্শ নেওয়া উচি শারীরিক উপযুক্ততা বা ফিটনেস ছাড়া ব্যায়াম করা নিরাপদ নয়


       ব্যায়াম করলে শুধু রক্তচাপ কমে না, ওজনও কমে সেটা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আরও সহায়ক হয় দুই একবার ব্যায়াম করলে খুব বেশী শক্তি খরচ হয় না ঠিকই, কিন্তু সারা বছর নিয়মিত ব্যায়াম করলে যে শক্তি খরচ হয় তার পরিমাণ  অনেক উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন সাধারণ লোক দিনে যে পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করে( ২৫০০-৩০০০ ক্যালরি), সারা দিনে অনেক সময় সে পরিমাণ ক্যালরি খরচ হয় না কিন্তু কেউ যদি সপ্তাহে ৫০০ থেকে ১০০০ ক্যালরি খরচ করতে পারে, তাহলে তার চর্বির পরিমাণ থেকে কেজি কমে যাবে আরও সুবিধা হচ্ছে নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীর শক্তির খরচ কমিয়ে কোন রকম আপোষে আসার সুযোগ দেয় না  কারণ ব্যায়াম করলে বেশী শক্তি খরচ করতে হয় এজন্য বিপাকের হার কমতে পারে না প্রত্যেকবার ব্যায়ামের পর বিপাকের হার বেশ কিছুক্ষণ বেশী থাকে সাধারণত থেকে ঘণ্টা পর্যন্ত এটা থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশী থাকে সুতরাং দিনের কর্ম ব্যস্ততার সঙ্গে ব্যায়াম যুক্ত করে আমরা বিপাকের হার সব সময় উঁচু রাখতে পারি অর্থাতখন বিশ্রামের সময়েও শরীর অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করে আপাতদৃষ্টিতে এর পরিমাণ খুব বেশী নয়, কিন্তু নিয়মিত এটা চালিয়ে গেলে ওজন কমতে থাকে ওজন কম্লে কাজকর্মে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য অনুভূত হয়; তখন ইচ্ছে করলে আরও বেশী ব্যায়াম করা সম্ভব হয় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখাও সহজ হয়  

            যে কোন ধরণের ব্যায়াম একটানা ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ধরে সপ্তাহে কম পক্ষে তিনবার করতে পারলে সেটাই একজনের জন্য শ্রেষ্ঠ ব্যায়াম তবে ব্যায়ামটা হতে হবে অ্যারোবিক; যেমনঃ হাঁটা, দৌড়ানো, সাঁতার কাটা অথবা জগিং  আর এটাকে কুইনিন গেলার মতো কোনরকমে সহ্য করলে হবে না, প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার সঙ্গে এটাকেও একটা অংশ করে নিতে হবে  

            ব্যায়াম করার আসল উদ্দেশ্য দুটোঃ যতটা সম্ভব বাড়তি শক্তি খরচ করা এবং স্ট্যামিনা (stamina) বাড়ানো, যেন শরীরের রক্ত সঞ্চালন সুষ্ঠু সুন্দর হয় এজন্য মাঝারী মাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়াম বেশী সময় ধরে করি ভালো উল্লেখ্য ব্যায়ামটা ভারী হওয়া আসল কথা নয়, আসল কথা হচ্ছে ব্যায়ামের মোট সময়  ক্যালরি খরচ হওয়া যেমন ব্যায়ামের শরনের ওপর নির্ভর করে, তেমন সময়ের ওপরও যেমনঃ এক ঘণ্টা হাঁটলে যে ক্যালরি খরচ হয়, কুড়ি মিনিট সাঁতার কাটলেও সেই পরিমাণ ক্যালরি খরচ হয় সুতরাং শক্ত ভারী কিছু না করে হালকা ব্যায়ামই বেশীক্ষণ করা উচি সময়ের যদি একান্তই অভাব হয়, তাহলে ভারী ব্যায়াম করা যেতে পারে তবে সেক্ষেত্রে উপযুক্ততা সম্পর্কে চিকিসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে       


ব্যায়াম সম্পর্কে তিনটি জরুরী কথাঃ
       ১। হালকা কিংবা ভারী? সেটা বড় কথা নয় শারীরিক ফিটনেস রাখার জন্য এমন ভাবে ব্যায়াম করতে হবে যেন হৃদঘাত বা পালস রেট স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে ৭০% বেড়ে যায়
    ২। কতক্ষন? ব্যায়ামের সময় গড়পড়তা ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হলে ভালো হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট ব্যায়াম করার সুপারিশ  করেছে
     ৩। কতবার? সপ্তাহে কমপক্ষে ৩ দিন ব্যায়াম করা দরকার

·         সুষম খাবার গ্রহণ

আমরা প্রতিদিন এমন অনেক খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করি যা মোটেও হৃদ-বান্ধব নয়; অর্থা হৃদপিণ্ডকে সুস্থ সতেজ রাখার জন্য উপযোগী নয় আবার যে সকল খাবার হৃদপিণ্ডকে সুস্থ সবল রাখতে সাহায্য করে সে গুলি আমরা খাই না এজন্য আমাদের সকলেরই জানা উচি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখার জন্য আমরা কি খাবো আর কি খাবো না


·         সম্পৃক্ত চর্বি এবং কোলেস্টেরল সমৃদ্ধ খাবার পরিহার করতে হবে

হৃদপিণ্ডের সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে সকল খাবারে সম্পৃক্ত চর্বি , ট্রান্স ফ্যাট এবং কোলেস্টেরল বেশী, সেগুলো অবশ্যই আমাদের খাবারের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে  জাতীয় তেল-চর্বিযুক্ত খাদ্য বেশী খেলে চর্বির পুরু আস্তর জমে রক্তনালীর ফুটো সহজেই বুজে যায় ফলে হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচল কমে যায় কিংবা অংশবিশেষে একেবারে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এর ফলে হৃদরোগ এবং মস্তিস্কের পক্ষাঘাত বা স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়

প্রতিদিন হৃদ-বান্ধব খাবারের তালিকায় কতটুকু চর্বি থাকতে পারে তার তালিকা নীচে দেওয়া হলঃ

চর্বির ধরণ
সুপারিশ
Ø      সম্পৃক্ত চর্বি
Ø     দৈনিক গৃহীত সর্বমোট ক্যালরির  শতাংশের কম হওয়া উচি
Ø      ট্রান্স ফ্যাট
Ø     দৈনিক গৃহীত সর্বমোট ক্যালরির  শতাংশের কম হওয়া উচি
Ø      কোলেস্টেরল
Ø  একজন সুস্থ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ দৈনিক ৩০০ মিঃ গ্রামের কম কোলেস্টেরল গ্রহণ করা উচি

Ø     যারা কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ সেবন করেন কিংবা যাদের রক্তে কম ঘনত্বের কোলেস্টেরল  (LDL) বেশী তাদের ২০০ মিঃ গ্রামের বেশী কোলেস্টেরল গ্রহণ করা উচি নয়  

খাবারে সম্পৃক্ত চর্বি এবং ট্রান্স ফ্যাট কমাতে হলে আমাদের মাখন, ঘি, মার্জারিন,ইত্যাদির ব্যবহার কমাতে হবে  ছাড়া গরু কিংবা খাসির চর্বিযুক্ত মাংস গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে  খাবারে চর্বির পরিবর্তে বিকল্প উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে যেমনঃ মাখনের পরিবর্তে ফলের সস, জ্যাম, জেলি কিংবা দই ব্যবহার করা যেতে পারে যে কোন কুকি, ক্র্যাকার, চিপস খাওয়ার আগে গায়ের মোড়কে কি লেখা আছে তা দেখা উচি আজকাল অধিকাংশ কোম্পানি কম চর্বিযুক্ত উপাদান ব্যবহার করছে  সকল খাবারে ট্রান্স ফ্যাট বেশী থাকে ট্রান্স ফ্যাট বলতে আংশিক বিজারিত বা ÓPartially hydrogenated fatÓ কে বোঝান হয় হোটেল কিংবা বাড়ীতে ভাজি করার জন্য যে তেল ব্যবহার করা হয়, অনেক সময় কড়াইয়ের অতিরিক্ত তেল রেখে দিয়ে পরের দিন আবার অন্য তরকারী রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়  ধরণের একবার ব্যবহার করা তেল রেখে দিলে ওটাতে প্রচুর ট্রান্স ফ্যাট তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে এজন্য প্রতিবার রান্নার সময় টাটকা তেল ব্যবহার করা উত্তম আগের দিনের ভাজাভুজির পর কড়াইয়ে রয়ে যাওয়া তেল ব্যবহার করা ক্ষতিকর আর অবশ্যই রান্নার জন্য অসম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত তেল যেমনঃ সয়াবিন, জলপাইয়ের তেল কিংবা ক্যানোলা তেল ব্যবহার করা উচি বাদাম এবং শসা বীজের তেলেও অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশী থাকে সম্পৃক্ত চর্বির পরিবর্তে অসম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত তেল ব্যবহার করলে রক্তে কোলেস্টেরল কম থাকে  

উপকারী তেল-চর্বি
ক্ষতিকর তেল-চর্বি©
Ø      জলপাইয়ের তেল

Ø      ক্যানোলা তেল

Ø      ট্রান্স ফ্যাট বিহীন মার্জারিন
Ø      মাখন

Ø      খাসী-গরু-শুকুরের চর্বি

Ø      ক্রিম সস  

Ø      নন-ডেয়ারী ক্রিম

Ø      হাইড্রোজেনেটেড মার্জারিন

Ø      কোকো মাখন

Ø  নারকেল তেল, পাম ওয়েল, তুলা বীজের তেল ইত্যাদি  

·         কম চর্বিযুক্ত প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে 


       আমাদের দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে হবে কিন্তু এজন্য এমন প্রোটিন করতে হবে যেখানে চর্বি নেই কিংবা চর্বির পরিমাণ খুব কম যেমন- চর্বিমুক্ত খাসী কিংবা গরুর মাংস,মুরগীর মাংস, মাছ, ডিমের সাদা অংশ ইত্যাদি ক্রীম মুক্ত বা সর ছাড়া দুধ খেলেও প্রচুর প্রোটিন পাওয়া যায় তবে চর্বি যুক্ত মাংস খাওয়ার চেয়ে মাছ ভালো কতগুলি মাছ আবার হৃদপিণ্ডের জন্য ভালো কারণ এতে হৃদপিণ্ডের জন্য উপকারী ওমেগা- ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে এরা রক্তের অতিরিক্ত ট্রাই গ্লিসারাইডের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে শীত প্রধান দেশের নদী- সাগরের মাছে সবচেয়ে বেশী ওমেগা- ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে যেমন- স্যামন, ম্যাকারেল, হেরিং মাছ ইত্যাদি কাঠ বাদাম, সয়াবিন এবং ক্যানোলা তেলেও প্রচুর ওমেগা- ফ্যাটি অ্যাসিড আছে  


       ডাল, মটর শুঁটি , সীমের বীজ এগুলি প্রোটিনের হিসেবে খুবই ভালো বাড়তি সুবিধা হচ্ছে এসবে চর্বি এবং কোন কোলেস্টেরল নেই কাজেই যারা চর্বি মুক্ত প্রোটিন খুঁজছেন তারা ডাল, মটর শুঁটি, সীমের বীচি খেতে পারেন প্রানীজ প্রোটিনের পরিবর্তে সয়া প্রোটিন ব্যবহার করা স্বাস্থ্যকর বীফ বার্গার কিংবা হ্যাম বার্গারের পরিবর্তে সয়া বার্গার খাওয়া যেতে পারে এতে বার্গার খাওয়ার শখও মিটবে; আবার অতিরিক্ত চর্বি কোলেস্টেরলের হাত থেকেও রেহাই পাওয়া যাবে

ভালো প্রোটিন
মন্দ প্রোটিন
·         কম ননী যুক্ত/ ননী মুক্ত দুধ

·         পনির, দই

·         ডিমের সাদা অংশ

·         মাছ

·         চামড়া মুক্ত মুরগীর মাংস

·         সীমের বীচি

·         সয়াবীন

·         কিমা মাংস
·         পূর্ণ ননীযুক্ত দুধ

·         গরু-খাসীর মাংস, যকৃত

·         ডিমের কুসুম

·         হট ডগ, সসেজ

·         বেকন

·         ফ্রাইড মিট কাবাব


·         শাক সবজী ফল-মূল বেশী খেতে হবে

শাক-সবজী ফল-মূলে প্রচুর লবণ এবং ভিটামিন থাকে এসবে ক্যালরি কম কিন্তু প্রচুর আঁশ থাকে  ছাড়া শাক-সবজী ফল-মূলে আরও কিছু বাড়তি উপাদান থাকে যা হৃদরোগ প্রতি রোধে সাহায্য করে; আর বেশী বেশী সবজী-ফল খেলে অতিরিক্ত চর্বি, মাংস, মাখন-স্ন্যাকসের হাত থেকেও মুক্ত থাকা যায়  জন্য প্রতিবার খাবারের সময় কিছু সবজী ফল গ্রহণ করা উচি  



যে সকল শাক সবজী ফল বেশী খাওয়া উচি
যে সকল শাক সবজী ফল কম  খাওয়া উচি
  • তাজা সবজী ফল
  • কম নোনা সবজী
  • কৌটায় সংরক্ষিত চিনি-মুক্ত ফল
  • নারকেল
  • ক্রীম সসযুক্ত সবজী
  • ভাজা সবজী
  • চিনির সিরাপে সংরক্ষিত ফল
  • চিনিযুক্ত হিমায়িত ফল

  • আকাঁড়া শস্য দানা গ্রহণ করা উপকারী
        আকর শস্য দানাতে প্রচুর পুষ্টি এবং আঁশ থাকে  গুলি হৃদপিণ্ডের জন্য তথা সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্য  উপকারী  অতি পরিশোধিত খাদ্যের চেয়ে আকর শস্য দানা বেশী পরিমাণে গ্রহণ করা ভালো

যে সকল শস্য দানা বেশী খাওয়া উচি
যে সকল শস্য দানা কম খাওয়া উচি
  • আকর গমের আটা
  • তুষযুক্ত আটার রুটি, পাউরুটি
  • আঁশ যুক্ত শস্য( প্রতিবার গ্রাম বা তার বেশী)
  • পরিশোধিত সাদা ময়দা
  • সাদ রুটি
  • মাফিনস
  • হিমায়িত ওয়াফেল
  • আকাঁড়া চাল, বার্লি, গম
  • ওট মিল
  • ডো নাট
  • বিস্কুট
  • কেক
  • পাই

  • এগ নুডুলস
  • মাখনযুক্ত পপকর্ণ
  • অতি চর্বিযুক্ত স্ন্যাক ক্র্যাকারস

  • খাবারে লবণের পরিমাণ কমাতে হবে  


        বিষয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে  

        অতিরিক্ত লবণ খেলে রক্তচাপ বেড়ে যায় আর উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগের একটি প্রধান কারণ  জন্য খাবারে লবণের পরিমাণ কম রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদিন একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের খাদ্যে সব মিলে আড়াই গ্রাম অর্থাএক চা চামচের কম লবণ থাকা উচি যাদের বয়স ৫১-এর বেশী এবং যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা কিডনির সমস্যা আছে তাদের কখনই প্রতিদিন দেড় গ্রামের বেশী সোডিয়াম গ্রহণ করা উচিনয় পাতে আলাদা লবণ না খেলে কিংবা রান্নার সময় তরকারীতে অতিরিক্ত লবণ যোগ না করা অবশ্যই খাবারে লবণ কমানোর জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ কিন্তু পাশাপাশি কথাও মনে রাখতে হবে আমাদের দৈনন্দিন আহারের  একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লবণ আসে কৌটা জাত খাদ্য , প্রক্রিয়াজাত করা খাবার, সুপ, হিমায়িত খাদ্য দ্রব্য ইত্যাদি থেকে অতএব লবণ গ্রহণের মাত্রা কমানোর জন্য ধরণের খাদ্য দ্রব্যের ব্যাপারেও আমাদের নজর রাখতে হবে

কম নোনা খাদ্য দ্রব্য
অতিরিক্ত নোনা খাদ্য দ্রব্য
  • মশলা এবং হার্বস
  • লবণের বিকল্প উপাদান
  • কম নোনা কৌটাজাত সুপ ইত্যাদি
  • কম নোনা সয়া সস, কেচাপ ইত্যাদি
  • পাতের আলগা লবণ
  • কৌটাজাত সুপ
  • টমেটু সস
  • সয়া সস


  • পাতে কম খাবার গ্রহণ 


    কি কি খেতে হবে, কোন কোন খাদ্য দ্রব্য স্বাস্থ্যের  জন্য ভালো, এটা জানা যেমন গুরুত্বপূর্ণ , কতটুকু খেতে হবে সেটা নির্ধারণ করাও তেমন গুরুত্বপূর্ণ এজন্য খেতে বসে প্রথমে প্লেটে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ না করা উত্তম এবং সবসময় পরিমিত খাদ্য গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ


·         খাবারের তালিকা আগে-ভাগে ঠিক করা  


     খাবারের তালিকা আগে ভাগে ঠিক করা থাকলে তা  স্বাস্থ্যের  জন্য উপকারী আমরা এতক্ষন যে সকল বিষয়ে উল্লেখ করেছি, সেভাবে কেউ যদি তার প্রতিদিনের খাবারের মেনু ঠিক করে নেন এবং তা নিয়মিত অনুসরণ করেন, তাহলে অবশ্যই উপকার হবে খাবারের দৈনিক মেনু ঠিক করার সময় আমাদের নীচের বিষয়গুলির প্রতি খেয়াল রাখতে হবেঃ

o       সবজী এবং ফলমূলের পরিমাণ বেশী রাখতে হবে

o       চর্বি মুক্ত প্রোটিনকে প্রাধান্য দিতে হবে

o       অসম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার রাখতে হবে

o       খাবারে লবণের পরিমাণ সীমিত রাখতে হবে

o       খাবারের পরিমাণ এবং বৈচিত্র্যের বিষয়টিকে ভুলে গেলে চলবে না


·         মাঝে মধ্যে বৈচিত্র্য দরকারী 


           হৃদ-বান্ধব  বিস্বাদ কিংবা আকর্ষণবিহীন হলে তো চলবে না এজন্য অবশ্যই খাবারে বৈচিত্র্য থাকতে হবে এজন্য মাঝে মধ্যে একটি ক্যান্ডি বার কিংবা একমুঠ আলুর চিপস খাওয়া দোষের নয় তবে এটা যেন মাত্রাতিরিক্ত কিংবা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে  

পরিশেষে বলা যায় আমরা হৃদ বান্ধব খাওয়া দাওয়া সম্পর্কে যে দিক নির্দেশনা দিয়েছি তা অনুসরণ করলে যে কেউ উপকৃত হবেন এটা বাস্তবসম্মত এবং আনন্দদায়কও বটে




·         পাতে লবণ খাওয়া পরিহার

সেই আদিকাল থেকে লবণের কত গুণগান কথায় বলে, নুন খাই যার গুণ গাই তার রোমান সৈনিকদের বেতন দেওয়া হতো লবণ কেনার জন্য এজন্য বেতন বলতে ইংরেজিতে  SALARY’  শব্দটি ব্যবহার করা হয় অতএব লবণের মূল্য অসাধারণ লবণ ছাড়া খাবার সুস্বাদু হয় না সত্য; কিন্তু কতটুকু লবণ খাওয়া উচিৎ এ নিয়ে অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কারণ অতিরিক্ত লবণ খেলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি খাবারে লবণ এবং পটাসিয়ামের নতুন নির্দেশনা সুপারিস করেছে একজন মানুষের দিনে ৫ গ্রাম অর্থাৎ প্রায় ১ চা চামচের কম লবণ খাওয়া উচিৎ আর দৈনিক পটাসিয়াম বরাদ্দ ৩.৫ গ্রাম ১০টি কলাতে এই পরিমান পটাসিয়াম পাওয়া যায় অবশ্য আরও অনেক ফলেও প্রচুর পটাসিয়াম থাকে  
খাবারে অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় লবণ বেশী খেলে রক্তরসের পরিমাণ বেড়ে যায় যার ফলে রক্তচাপও বেড়ে যায় বলে মনে করা হয় এজন্য খাবারে লবণের পরিমাণ সীমিত রাখা দরকার
রূপকথার গল্পে রাজা তার তিন কন্যাকে প্রশ্ন করেছিলেন, তাকে কে কেমন ভালবাসে? ছোট রাজকন্যা তাকে লবণের মতো ভালবাসে শুনে রাজা খুব রেগে গিয়েছিলেন তিনি রেগে গেলেও পরবর্তীতে ছোট রাজকন্যা অবশ্য প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে লবণের মতো ভালবাসাই সবচেয়ে উত্তম আমরা অবশ্য জানিনা গল্পের রাজার উচ্চরক্তচাপ ছিল কিনা? তবে এখন এটা নিশ্চিন্তে বলা যায় বর্তমান সময়ের কন্যাগণ তাদের পিতৃদেবকে আর যাহোক ভালবাসায় পাতে লবণ আধিক্যের মাধ্যমে রক্তচাপ বাড়ার সুযোগ দেবে না বরং উচ্চরক্তচাপ আক্রান্ত পিতাদের খেতে বসে একটু বাড়তি পাতের লবণের জন্য  জায়া-কন্যাদের  শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে খেতে হবে
খাবারের লবণের বৈজ্ঞানিক নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দৈনিক আড়াই গ্রামের বেশী সোডিয়াম গ্রহন করি এ পরিমাণ সোডিয়াম  ৬ গ্রাম বা ১ চা চামচ খাবার লবণের সমতুল্য কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশে এখন পরিস্কার জানানো  হয়েছে একজন মানুষের দিনে ৫ গ্রাম অর্থাৎ প্রায় ১ চা চামচের কম লবণ খাওয়া উচিৎ এটা ভাত-তরকারি  এবং পাতের লবণসহ হিসেব করা হয়েছে অনেকে মনে করেন পাতে লবণ না খেয়ে তরকারিতে বেশী পরিমাণে লবণ ব্যবহার করলে কোন ভয় নাই আবার কেউ কেউ বলেন পাতে কাঁচা লবণ না খেয়ে তরকারিতে ভাজা লবণ খেলে ভালো কিন্তু এ সকল কথা সত্য নয় লবণ যে ভাবেই ব্যবহার করা হোক না কেন একজন সুস্থ মানুষের সার্বিকভাবে এক চা চামচের বেশী লবণ খাওয়া উচিৎ নয়
আজকাল আধুনিক  সুপার মল কিংবা চেইন শপগুলিতে হিমায়িত খাবার কিংবা কৌটাজাত ফলমূল এবং শব্জি বিক্রি হয় মাছ-মাংস, রান্না করা ভাত, রুটি, পাস্তা, নান রুটি ইত্যাদি হরেক রকম খাবার এভাবে সংরক্ষিত অবস্থায় ব্যাপকভাবে বিক্রি হয় যারা হোস্টেল, মেস কিংবা ডরমিটরিতে বাস করেন অথবা কর্মব্যস্ততার কারণে রান্না করার সময় পান না তাদের নিকট এ সকল রেডিমেড খাবার অত্যন্ত জনপ্রিয় গৃহবধূর হাতে রান্না করা সুস্বাদু গরম তরকারি আর ভাত যাদের নিয়তিতে নাই তাদের জন্য মোড়ক জাত নানাবিধ প্রস্তুত খাবার দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতোই কম লবণযুক্ত ঘোল স্বাস্থ্যের  জন্য উপকারী  কিন্তু মোড়কজাত সংরক্ষিত খাবারের ব্যপারে সাবধান
প্রাকৃতিক ভাবেই বিভিন্ন খাবারে লবণ থাকে যেমন- দুধে প্রতি ১০০ গ্রামে ৫০ মিঃ গ্রাম এবং ১০০ গ্রাম ডিমে ৮০ মিঃগ্রাম লবণ থাকে খাবার সংরক্ষণের জন্য নানাবিধ রাসায়নিক উপাদানের কথা বাদ দিলেও, এসকল খাবারে অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করা হয়ে থাকে  এজন্য মোড়ক জাত খাবার কেনার আগে মোড়কের গায়ে উল্লিখিত লবণের পরিমাণ দেখে নেওয়া উচিৎ উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় আধ কাপ পরিমাণ হিমায়িত মটরশুঁটিতে ১২৫ মিঃ গ্রাম লবণ থাকে সমপরিমান কৌটাজাত মটরশুঁটিতে ৩৮০ মিঃ গ্রাম লবণ থাকে অর্থাৎ কৌটাজাত মটরশুঁটিতে সাধারণ হিমায়িত মটরশুঁটির চেয়ে  তিনগুণ বেশী লবণ থাকে অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন- পাউরুটিতে ২৫০ গ্রামে ১০০ মিঃ গ্রাম আর বেকনে প্রতি ১০০ গ্রামে ১৫০০ মিঃগ্রাম লবণ থাকে  পপ কর্ণে ১০০ গ্রামে ১৫০০মিঃগ্রাম, সয়া সসে ১০০ গ্রামে ৭০০০ মিঃগ্রাম লবণ থাকে এভাবে সব সংরক্ষিত খাবারের প্যাকেটে লবণের পরিমাণ দেখে নিলে বোঝা যায় আমরা কি পরিমাণ লবণ গ্রহণ করছি 
লবণ ছাড়া যাদের নিকট খাবার বিস্বাদ মনে হয় তারা বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন ধরনের মশলা যেমন- আদা, মরিচ, রসুন, লবঙ্গ, গোল মরিচ, ব্যাসিল, পার্স লি , পেস্তা ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারেন
পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্যের মধ্যে রয়েছে- শিম এবং মটরশুঁটি ( প্রতি ১০০ গ্রামে ১৩০০ মিঃগ্রাম), বাদাম ( প্রতি ১০০ গ্রামে ৬০০ মিঃগ্রাম), সব্জি যেমন- পালং , বাঁধাকপি, পার্সলি(১০০গ্রামে ৬০০ মিঃগ্রাম) এবং বিভিন্ন ফল যেমন-কলা, পেঁপে, খেজুর (১০০ গ্রামে ৩০০ মিঃগ্রাম)
আমাদের বর্তমান প্রবণতা হচ্ছে লবণ বেশী খাওয়া আর পটাসিয়াম কম খাওয়া কিন্তু বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন এটা উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ থাকা মানেই হৃদরোগ এবং পক্ষাঘাত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া আর হৃদরোগ এবং পক্ষাঘাত এখন পৃথিবীতে মানুষের মৃত্যু এবং শারীরিক অক্ষমতার প্রধান কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমান নির্দেশনায় ২ বছরের ওপরের শিশুদের জন্যও করনীয় ব্যাখ্যা করা হয়েছে এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়  কারণ আজকের যে শিশুটির রক্তচাপ বেশী, বড় হলেও তার উচ্চ রক্তচাপ থাকে 


·         মদ্যপান পরিহার করা
পাশ্চাত্যে  অতিরিক্ত মদ্যপান করার জন্য ৫ থেকে ৩০ শতাংশ লোকের উচ্চ রক্তচাপ হয় সুস্থ লোক মদ্যপান করলেও তার রক্তচাপ কিছু বেড়ে যায় একটি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সপ্তাহে মদ্যপানের পরিমাণ ৪৫২ মিলিলিটার থেকে ৬৪ মিলিলিটারে নামিয়ে আনলে তিন সপ্তাহের মধ্যে গড়পড়তা রক্তচাপ  ৫/৩ মিঃ মিঃ পারদচাপ কমে যায়  
সুরা কিভাবে রক্তচাপ বাড়ায় তা জানা যায়নি তবে অনেকে মনে করেন সংবেদী স্নায়ুতন্ত্রের অতিরিক্ত সক্রিয়তা এবং রক্তে করটিসলের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে এমনটি ঘটে সুরা পান কমালে রক্তচাপ কমে যায়, সেটা বড় কথা নয় মদ্যপ ব্যাক্তির স্বাস্থ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে জটিল থাকে এবং অন্যান্য কারণে তাদের মৃত্যু হার বেশী আর মদ্যপ ব্যক্তিরা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সেবন করতে অধিক গাফিলতি  করে এজন্য সুরাপান পরিহার করা সার্বিকভাবে রোগীর জন্য মঙ্গলজনক


·         ধূমপান পরিহার করা
উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও ধূমপান হৃদরোগের জন্য একটি বড় ঝুঁকি এজন্য ধূমপান পরিহার একান্ত দরকারী উন্নত দেশগুলিতে ব্যাপক ধূমপান বিরোধী প্রচারণার কারণে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে এবং ধূমপানের পরিমাণও কমতে শুরু করেছে কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনাহার-অপুষ্টিতে ভোগা গরীব জনগণ ক্রমেই আরও বেশী করে বিরি-সিগারেটের ধোঁয়ার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে
এক হিসেবে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে হৃদরোগে প্রতিবছর সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশী লোক মারা যায় এর মধ্যে ধূমপানের কারণে মারা যায় ৩০% অর্থাৎ প্রায় পৌনে দুই লাখ প্রতিদিন এক প্যাকেট সিগারেট হৃদরোগের ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয় অধূমপায়ীদের চেয়ে ধূমপায়ীদের হৃদ ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তিনগুণ বেশী ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার ১২ মাসের মধ্যে ঝুঁকির মাত্রা কমে যায় তবে অধূমপায়ীদের তুলনায় তখনও তা দ্বিগুণ থাকে আরও দীর্ঘ দিন ধূমপান থেকে বিরত থাকলে ঝুঁকির মাত্রা কমে অধূমপায়ীদের প্রায় সমপর্যায়ে এসে যায়
            উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ধূমপান ছেড়ে দেওয়া জন্য উৎসাহিত করা উচিৎ সকলের উপদেশ এবং ধূমপান পরিত্যাগের কৌশল শেখানোর মাধ্যমে এটা বাস্তবায়িত করা যায় তবে মনে রাখতে হবে রোগীর ইচ্ছাই ধূমপান পরিত্যাগের জন্য যথেষ্ট মনে রাখতে হবে ধূমপান না ছেড়ে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খেলে হৃদরোগ কিংবা পক্ষাঘাতের সম্ভাবনা কমে না
           

·         শিথিলায়ন ও বায়ো ফিডব্যাক
মানসিক চাপ এবং দুশ্চিন্তার ফলে সাময়িকভাবে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে এসব ক্ষেত্রে  মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং শিথিলায়নের (relaxation) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মেডিটেশন এবং বায়ো ফিডব্যাক ব্যবহার করেও অনেক ক্ষেত্রে উপকার পাওয়া গিয়েছে কিন্তু এ সকল পদ্ধতি উপযুক্ত প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শেখা ছাড়া প্রয়োগ করা উচিৎ নয় এখানে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার অবকাশ নেই তবে একটি কথা বলা যায়, প্রশান্ত চিত্তে জীবনকে গ্রহণ করতে পারলে তা আনন্দদায়ক এবং উপভোগ্য হয়ে ওঠে তখন রক্তচাপ বাড়ার সুযোগ স্বভাবতই কমে যায়  সুতরাং সব উচ্চ রক্তচাপের রোগীকেই এ দিকটি ভেবে দেখতে হবে এবং চিকিৎসার সময় এটা অবহেলা করা উচিৎ নয়    


No comments:

Post a Comment